
ঢাকা : বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ২৭ টি দেশে যুদ্ধ বা গৃহযুদ্ধ চলমান। এর মাঝে জড়িত রয়েছে ব্যবসা অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি। গৃহযুদ্ধ এক ধরনের লড়াই যা কিনা নির্দিষ্ট কোন রাষ্ট্রের সাথে অথবা দেশের অভ্যন্তরে সাংগঠনিকভাবে দুই বা ততোধিক দল বা গোষ্ঠী সরাসরি যুদ্ধে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। সাধারণভাবে বলতে গেলে, এই গৃহযুদ্ধের ফলে দুটি স্বাধীন দেশ সৃষ্ট হয়। যা কিনা পূর্বে সকলে এক সাথেই ছিলো। এক নেতার নিয়ন্ত্রণে।
একপক্ষ কর্তৃক দেশ বা এলাকা নিয়ন্ত্রণ, অঞ্চল বা এলাকার স্বাধীনতার ঘোষণা অথবা সরকারের নীতি-নির্ধারণে পরিবর্তনের জন্য চাঁপ প্রয়োগ এ যুদ্ধের প্রধান উদ্দেশ্য। এই হলো মোটা দাগে গৃহযুদ্ধের ডামাডোলের আগমন।
এই পৃথিবীতে রোমান আমলেও গৃহযুদ্ধের আলামত পাওয়া যায়। তবে কাছাকাছি সময়গুলির মাঝে পৃথিবীতে বেশকিছু গৃহযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। এরমাঝে, ১৬৪২ সালে ইংরেজ গৃহযুদ্ধ যা কিনা ৯ বছর পরে ১৬৫১ সালে শেষ হয়। ভয়াবহতা নিশান হিসেবে ১,২৭,০০০ জনের মৃত্যু ।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধে ১৮৬১ সাল থেকে শুরু করে ১৮৬৫ সাল অবদি দুই পক্ষের ৬ লাখ মানুষের প্রাণহানি হয়। হতাহত হয় আরো কয়েক লাখ। এছাড়া স্মরণীয় গৃহযুদ্ধ হিসেবে রয়েছে, চীনের গৃহযুদ্ধ, ভিয়েতনাম গৃহযুদ্ধ, স্পেনের গৃহযুদ্ধ, এমনকি রাশিয়া অক্টোবর বিপ্লব ইতিহাসে জায়গা করে নিযেছে। রাশিয়ার ৪ বছরের গৃহযুদ্ধে ৭০,০০,০০০–১,২০,০০,০০০ নিহত হন। তাদের অধিকাংশই বেসামরিক জনগণ।
এই যে গৃহযুদ্ধ নানা কারণে সংঘটিত হলেও মূলত দুটি প্রধান কারণ থাকে।
রাষ্ট্রের নেতৃত্ব গ্রহণ কিংবা দেশ পরিচালনা পদ্ধতি বিষয়ে বিভিন্ন দলের মধ্যে মতানৈক্যে জন্ম নিলে গৃহযুদ্ধ ঘটে। দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে কোন একটি দল যদি নির্বাচনের ফলাফল মেনে না নেয় কিংবা দুদলের মধ্যে কোনরূপ চুক্তি সম্পাদন না হয়, তাহলেও তা গৃহযুদ্ধের সূচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখে।
এক দলভূক্ত জনগোষ্ঠী ভাষা, সংস্কৃতি ইত্যাদিতে ভিন্নতাজনিত কারণে যদি দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ হতে ইচ্ছা প্রকাশ না করে তাহলেও গৃহযুদ্ধ হতে পারে। এ ধরণের যুদ্ধ বিচ্ছিন্নতাবাদ নামেই পরিচিত পায়। তখন তারা দেশ বিভাজন করে নতুন একটি স্বাধীন দেশের জন্যে গৃহযুদ্ধে সম্পৃক্ত হয়। খুব কমসংখ্যক জাতীয় নেতৃবৃন্দ এতে অংশ নিতে পারেন। অধিকাংশ জাতীয় নেতা-ই দেশ বিভাজনে অংশ নিতে চান না যার ফলশ্রুতিতে অনিবার্য্যভাবে তা গৃহযুদ্ধের আকারে মোড় নেয়।
কখনো এমনও হয়, দলভূক্ত জনগোষ্ঠী সম্পূর্ণ নতুন দেশ তৈরীতে আগ্রহী নন। কিন্তু তারা তাদের অধিকারবোধ ও দাবী-দাওয়া আদায়ের লক্ষ্যে এ সংক্রান্ত বিষয়ে দেশ পরিচালনা পদ্ধতিতে সম্পৃক্ত হতে চায। এ ধরণের গৃহযুদ্ধ মূলত দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন আঞ্চলিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
গৃহযুদ্ধ উচ্চ পর্যায়ের সংঘর্ষে রূপ নেয় যাতে প্রায়শই অনুমোদনকৃত, প্রশিক্ষিত, সংগঠিত, বৃহৎ আকৃতির নিয়মিত সামরিক বাহিনী জড়িয়ে পড়ে।
গৃহযুদ্ধে বিপুলসংখ্যক ব্যক্তির প্রাণহাণির স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির বিনাশ ঘটে। স্বল্পসময় থেকে শুরু করে দীর্ঘ মেয়াদে অনেক বছর পর্যন্ত গৃহযুদ্ধ চলতে পারে। এর কারণ সম্ভবতঃ গৃহযুদ্ধ খুব দ্রুত জটিলতর হয়ে পড়ে এবং মতভেদজনিত পার্থক্যতা। দুই পক্ষের মধ্যে এ যুদ্ধের সূচনা ঘটলেও পরবর্তীকালে বিভিন্ন দল, উপ-দলের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রত্যেকটি দল একে-অপরের বিরুদ্ধে আধিপত্য বিস্তারে অগ্রসর হয়। যে সকল দল গৃহযুদ্ধে সম্পৃক্ত নয়, তারাও উভয় পক্ষ থেকে আক্রান্ত হবার ভয়ে অস্ত্রশস্ত্র মজুত রাখে।
নানা ক্ষমতাধর দেশ, আন্তর্জাতিক সংস্থা কিংবা সরকার পক্ষ থেকে শান্তি চুক্তির মাধ্যমে কখনো কখনো গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি হয়ে থাকে। তা না হলে গৃহে মানুষ শান্তিতে থাকে না। গৃহের বাইরেও শান্তি থাকে না।
আহমদ মাজহারুল হক
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
সম্পাদক : মোঃ তুহিন আহামেদ
নির্বাহী সম্পাদক : আহমদ মাজহারুর হক (আশরাফ)
প্রকাশক : শাহিনুর রহমান
Copyright © 2026 বর্তমান সংবাদ. All rights reserved.