সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৪৪ পূর্বাহ্ন

শীতের রুপে

আহমদ মাজহারুল হক / ২৮৫ বার পঠিত
প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর, ২০২৫, ১২:১৬ পূর্বাহ্ণ

আহমদ মাজহারুল হক।। বাংলাদেশের শীত আসে খুব ধীরে, খুব কোমলভাবে। ঠিক যেন কোনো নরম কুয়াশা ভোরের মাঠের উপর দিয়ে হেঁটে এসে বসে থাকে। হেমন্তের শেষে ধান কাটা হয়ে গেলে, বাতাসে যখন খড়ের গন্ধ মিশে থাকে, ঠিক তখনই উত্তর দিক থেকে হালকা ঠান্ডা ঢুকে পড়ে। সেই ঠান্ডা কখনো খুব কাঁপুনি ধরায় না—কিন্তু অনুভূতিতে এক নরম পরিবর্তন এনে দেয়।

আজকের শীত আগের মতো তীব্র নয়। বিশেষ করে শহরে শীত মানে এখন প্রকৃতির কুয়াশার সাথে ধোঁয়া–ধুলোর একটা মিশ্র রঙ। সকালে রাস্তায় নামলে দেখা যায় আলো জ্বালিয়ে গাড়ি চলছে, মানুষের হাতে ধোঁয়া ওঠা কাপের গরম চা, মুখে মাস্ক, ঠান্ডা বাতাসের সাথে মিলেমিশে থাকা ব্যস্ততা। শীত যেন আধুনিক জীবনের অংশ হয়ে গেছে—কুয়াশার রোমান্টিক আলোর চেয়ে বাস্তবতার ঘনত্ব বেশি।

তবুও শীত এলে মানুষের ভিতরে একটা অন্যরকম মায়া জেগে ওঠে। পিঠার গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে ঘরে ঘরে—ভাপা, চিতই, দুধ কুলি, পাটিসাপটা। চুলার পাশে বসে গল্প করার এই সময়টা বাংলার নিজস্ব উৎসব। আবার শীত মানে মানবিকতার সময়। দেশের নানা জায়গায় শীতবস্ত্র বিতরণ হয়, মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়ায়—একটা সহমর্মিতার পরিবেশ তৈরি হয়।

গ্রামের শীত, বিশেষ করে অতীতের গ্রামীণ শীত, ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। বয়স্করা এখনও বলেন—তখন শীত সত্যিই কনকনে হতো। রাতে আগুন জ্বালিয়ে পরিবারের সবাই গোল হয়ে বসত, গল্প হতো, গান হতো, ধাঁধাঁ চলত। সকাল হলে ধনখেতের মাথায় সাদা শিশির দেখে মনে হতো দিগন্তে কেউ নরম তুলো বিছিয়ে রেখেছে। হাঁটলে পায়ের নিচে শিশিরের শব্দ পাওয়া যেত। নদীর পানি এমন ঠান্ডা যে হাত-পা ডুবাতে সাহস লাগত। শীত ছিল প্রকৃতির পবিত্র নীরবতায় ভরা এক ঋতু। এই শীত আবার প্রেমেরও সময়। কুয়াশা ঢাকা সকাল বা নরম রোদের বিকেল—এই সময়গুলোতে প্রেমে একটা আলাদা আবেশ থাকে। চায়ের কাপ ভাগাভাগি করা, রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে দূরের কুয়াশা দেখা, কিংবা নদীর ধারে মৃদু বাতাসে গল্প—শীত এমনই একটা পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে কথাটা কম থাকে, অনুভূতিটুকু বেশি। প্রকৃতি শীতে আরও নীরব, আরও কোমল হয়ে ওঠে। ভোরের মাঠে কুয়াশার পর্দা, তালগাছের মাথায় জমে থাকা শিশির, দূরে ভেসে আসা ট্রেনের শব্দ—সব মিলিয়ে শীত যেন একটুকরো কবিতা। দুপুরে নরম রোদ পড়লে ঘুম পায়, সন্ধ্যায় বাতাসে হালকা কাঁপুনি। শীতকে পড়তে গেলে বইয়ের প্রয়োজন নেই—শীত নিজেই একটি দীর্ঘ, শব্দহীন কবিতা।গবেষণার দিক থেকে দেখলে, বাংলাদেশে শীতের স্বরূপ বদলে যাচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শীত ছোট হচ্ছে, কম তীব্র হচ্ছে। উত্তরাঞ্চলের শৈত্যপ্রবাহ আগের তুলনায় কম স্থায়ী। শীতের সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকিও—ধুলাবালি, দূষণ, অ্যাজমা বা শ্বাসকষ্টের সমস্যা বাড়ে। আবার কৃষিক্ষেত্রে ঠিক উল্টো—শীত বাংলাদেশে উৎপাদনের শক্তি। এ মৌসুমেই বোরো ধানের চারা, গম, আলু, সরিষা, সবজির মূল উৎপাদন হয়।

বাংলাদেশের শীত তাই কখনো কনকনে হাওয়া, কখনো পিঠার গন্ধ, কখনো গল্পের আড্ডা, কখনো প্রেমের নরম আলো, আবার কখনো গবেষণা ও বাস্তবতার কঠিন সতর্কবার্তা। শীত আমাদের স্মৃতিতে, আবেগে, কবিতায়, আর বাস্তবতার প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে আছে।শীত শুধু ঋতু নয়—এটা সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া আমাদের জীবনের, সংস্কৃতির, অনুভূতির এক নীরব গল্প।

আহমদ মাজহারুল হক, লেখক ও সাংবাদিক

Facebook Comments Box


এই ক্যাটাগরির আরো খবর
এক ক্লিকে বিভাগের খবর